Nov 04 2023

নিরামিষ নাকি আমিষ?

ইদানীং কালে আমাদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে মোটামুটি নিরবে দলে দলে অন্তঃকোন্দল হয়ে থাকে। আমাদের অনেকের ধারণা, যে ব্যক্তি নিরামিষ খাবার খায় তার মাঝে শুধু পূণ্য আর পূণ্য আর যে আমিষ খায় তার পূণ্যের অংশ শূন্য। আবার যারা আমিষ খায় তারাও তাদের মতো করে হরেক রকম যুক্তি তৈরি করে। আর এইসব নিয়ে মোটামুটি আমাদের সনাতনী সমাজের মাঝে দুইটা পক্ষ কাজ করছে আর মনে হচ্ছে এই নিরামিষ ও আমিষের মাঝে আমাদের ধর্ম এখন আটকা পরে আছে৷ তাই আমি আজকে আলোচনা করার চেষ্টা করবো খাদ্য নিয়ে আমাদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ বেদ বা সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান গীতা কি বলে। 

আমাদের কোনো ধর্মগ্রন্থে নিরামিষ বা আমিষ বলতে বাস্তবে কিছু নাই, আমিষ শব্দের মূল আবিস্কারক হলো বিজ্ঞানীরা, আর তার বিপরীতে একটা শব্দ আবিস্কার হয় যাকে নিরামিষ বলা হয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের সনাতন ধর্ম বলে আহার ৩ প্রকার- সাত্ত্বিক, রাজসিক, তামসিক। আর ৩ প্রকার আহার থেকে ৩ গুন – সত্ত্বঃ, রজঃ ও তমঃ গুনের সৃষ্ঠি হয়ে থাকে। মানে আপনি যে প্রকার আহার গ্রহণ করবেন তার উপর ভিত্তি করে আপনার গুন প্রকাশিত হবে। 

বেশি দূরে যাবো না, শ্রীমদ্ভাগবত গীতার সপ্তদশ অধ্যায়ে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কি বলেন দেখি একটু…

আহারস্তপি সর্বস্য ত্রিবিধো ভবতি প্রিয়ঃ। 

যজ্ঞস্তপস্তথা দানং তেষাং ভেদমিমং শৃণু।।৭।।

অনুবাদঃ সকল মানুষের আহারও তিন প্রকার প্রীতিকর হয়ে থাকে। তেমনই যজ্ঞ, তপস্যা এবং দানও ত্রিবিধ। এখন তাদের এই প্রভেদ শ্রবণ কর।

আয়ুঃসত্ত্ববলারোগ্যসুখপ্রীতিবিবর্ধনাঃ।

রস্যাঃ স্নিগ্ধাঃ স্থিরা হৃদ্যা আহারাঃ সাত্ত্বিকপ্রিয়াঃ।।৮।।

অনুবাদঃ যে সমস্ত আহার আয়ু, সত্ত্ব, বল, আরোগ্য, সুখ ও প্রীতি বর্ধনকারী এবং রসযুক্ত, স্নিগ্ধ, স্থায়ী ও মনোরম, সেগুলি সাত্ত্বিক লোকদের প্রিয়।

(সহজ বাংলায়, যে খাবার খাইলে জীবের আয়ু ও শক্তি বৃদ্ধি পায়, দেহ নীরোগ থাকে, সুখ ও শান্তি লাভ করে এবং খাবার গুলো রসযুক্ত, সতেজ ও সজীব হয়ে থাকে সে খাবার গুলোকেই সাত্ত্বিক খাবার বলে থাকে, মানে এই খাবার গুলো সাত্ত্বিক লোকদের প্রিয় হয়ে থাকে) 

কট্বম্ললবণাত্যুষ্ণতীক্ষ্মরুক্ষবিদাহিনঃ। 

আহারা রাজসস্যেষ্টা দুঃখশোকাময়প্রদাঃ।।৯।।

অনুবাদঃ যে সমস্ত আহার অতি তিক্ত, অতি অম্ল, অতি লবণাক্ত, অতি উষ্ণ, অতি তীক্ষ্ম, অতি শুষ্ক, অতি প্রদাহকর এবং দুঃখ, শোক ও রোগপ্রদ, সেগুলি রাজসিক ব্যক্তিদের প্রিয়।

(সহজ বাংলাতে, অতিরিক্ত তিতা বা কড়া, টক বা চুকা, লবণাক্ত, শুষ্ক জাতীয় খাবার এবং যা আমাদের মনে ও শরীরে দুঃখ, রোগ, শোক বৃদ্ধি করে আমাদের মানসিক ও শারীরিক ভাবে অসুস্থ করে তুলে তাই রাজসিক খাবার) 

যাতযামং গতরসং পূতি পর্যষিতং চ যৎ। 

উচ্ছিষ্টমপি চামেধ্যং ভোজনং তামসপ্রিয়ম্।।১০।।

অনুবাদঃ আহারের এক প্রহরের অধিক পূর্বে রান্না করা খাদ্য, যা নীরস, দুর্গন্ধযুক্ত, বাসী এবং অপরের উচ্ছিষ্ট দ্রব্য ও অমেধ্য দ্রব্য, সেই সমস্ত তামসিক লোকদের প্রিয়।

(সহজ বাংলা, যে খাবার এক প্রহর বা ৩ ঘন্টা পূর্বে রান্না করা হয়, যে খাবারে কোনো  রস থাকে না, পচা  ও দুর্গন্ধযুক্ত, বাসী খাবার এবং অপরের উচ্ছিষ্ট দ্রব্য সে সমস্ত তামসিক লোকদের প্রিয়) 

কি বুঝছেন কিছু? বুঝেলে তো বেশ ভালো, না বুঝলে আরেকটু বলি। আহারের সাথে বাস্তবে পাপ বা পুণ্যের কোন যোগসূত্র নেই, যদি আপনি বেদ বা গীতা মানেন। ঈশ্বর কোথায় বলে নাই এইটা খাইলে পাপ হবে এইটা খাইলে পূণ্য হবে। বলেছে কোন খাবার গুলো কোন মানুষের প্রিয়। আবার অঞ্চলভেদেও এই আহার গুলো পরিবর্তন হতে পারে, যেমন আমরা বাঙ্গালীরা ভাত খাইলে সুস্থ থাকি তাই আমাদের প্রধান খাদ্য ভাত, যা সাত্ত্বিক আহার হিসাবে বিবেচ্য কিন্তু রুটি যদি নিয়মিত খাই তাহলে হয়তোবা অসুস্থ হয়ে যেতে পারি সে ক্ষেত্রে এই রুটি আমাদের জন্য আর সাত্ত্বিক থাকছে না, কিন্তু যে সব মানুষ রুটি খেয়ে সুস্থ থাকে সেটা আবার তাদের জন্য সাত্ত্বিক থেকে যাচ্ছে, ভাত খাইলে অসুস্থ হয়ে যায় বলে সেটা তাদের জন্য তামসিক বা রাজসিক হয়ে যাচ্ছে৷ 

প্রচন্ড শীত প্রধান দেশে যারা বসবাস করে তারা তাদের শরীরের তাপমাত্রা ধরে রাখতে অতিরিক্ত গরম, উত্তেজক খাবার ও ড্রিংক্স করে থাকে যা তাদেরকে সুস্থ রাখতে সহযোগিতা করে তাই সে সব খাবার গুলো তাদের জন্য সাত্ত্বিক খাবার হিসাবে থেকে যাবে, কিন্তু আমাদের অঞ্চলের মানুষ যদি নিয়মিত ড্রিংক্স খাইতে থাকে তা কিন্তু নেশাজাতীয় খাবার হিসাবে বিবেচনা করা হবে যা তামসিক খাবার। এখন বুঝছেন নাকি আরেকটু বলতে হবে? আশাকরি কিছুতো বুঝছেন তাও আরো সুস্পষ্ট করি… চলুন এইবার বেদ দেখি। 

ভক্ষ্য ও অভক্ষ্য নির্ণয়ে বেদ-ই একমাত্র স্বতঃ প্রমাণ! বেদ আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ সংবিধান, বেদেমনুষ্যের জন্য খাদ্য নির্ণয় করা আছে। যে খাদ্য গ্রহন করিলে মানুষ দীর্ঘায়ু, বলিষ্ঠ ও মেধাবী হয় সে খাদ্য গ্রহণ করাই উত্তম। যথাঃ—

ব্রীহি মত্তং যবমত্তমথো তিলম্। 

এষ বাং ভাগো নিহিতো রত্ন ধেয়ায় দন্তৌ মা হিংসিষ্টং পিতরং মাতরং চ।।

(অথর্ববেদ ৬।১৪০। ২ )

বঙ্গানুবাদঃ —  

চাউল, যব, মাষ এবং তিল ভক্ষণ কর।

রমণীয়তার জন্য ইহাই তোমাদের জন্য বিহিত

হইয়াছে! পালক ও রক্ষককে ভক্ষণ করিও না।

পুষ্টিং পশুনাং পরি জগ্রভাহং চতুষ্পদাং দ্বিপদাং য়চ্চ ধান্যম্ ।

পয়ঃ পশুনাংরসমোষ ধীনাং বৃহস্পতিঃ সবিতা মে নি য়চ্ছাৎ ।।

 (অথর্ব্ববেদ ১৯। ৩১। ৫ )

বঙ্গানুবাদঃ— চতুস্পদ পশু, দ্বিপদ পশু এবং ধান্য হইতে আমরা পুষ্টি গ্রহণ করি । এজন্য সৃষ্টি কর্ত্তা পরমেশ্বর আমাদিগকে পশু দুগ্ধ ও ঔষধির রস প্রদান করিয়াছেন। 

কত চমৎকার বিশ্লেষণ, অথচ আমরা মারামারি করছি কে আমিষ খাচ্ছি কে নিরামিষ খাচ্ছে তা নিয়ে। শ্রীকৃষ্ণের কথাও যদি বিশ্বাস করি তাহলে সবচেয়ে বেশি মেধাবী, শারীরিক গঠন, উন্নত জীবন যাপন ও চিন্তাভাবনা, গড় আয়ু, বুদ্ধিবৃত্তি রোগ মুক্ত শরীর ধারণ করে আছে উন্নত বিশ্বের লোকজন যেখানে নাম মাত্র সনাতনী ও উপস্থিত নাই৷

শ্রীকৃষ্ণের কথা অনুযায়ী এইটা তো স্পষ্ট যে, যে সকল খাবার আমাদের মনকে বিচলিত করে তুলে, রোগ ও শোকে কাতর করে তুলে,  তা কোন ভাবেই সাত্ত্বিক খাবার না। তাহলে চিন্তা করুন নিরামিষ আমিষ তো খান, সাত্ত্বিক খাবার কয়জনে খান? যেকোনো খাবার ৩ ঘন্টার পুরাতন হয়ে গেলে সেখাবার আর সাত্ত্বিক থাকে না, সেটা হোক নামে আমিষ বা নিরামিষ, তখন সেটা হয়ে যাবে তামসিক খাবার। আর আপনি যা খাবেন তাই আপনার গুন কে উপস্থাপন করবে। 

যারা ধ্যান, জ্ঞান চর্চার মাঝে আছে তাদের জন্য যা সাত্ত্বিক আবার যে যুদ্ধের ময়দানে আছে তার জন্য তা সাত্ত্বিক হবে না। কারণ যুদ্ধ করতে শক্তি লাগে আর ধ্যান জপ করতে স্থিরতা লাগে সে হিসাবে আপনার খাদ্য তালিকা নির্বাচন করতে হবে। 

নিরামিষ এর নাম করে যে প্রচলিত খাবার আমরা খাই তাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাত্ত্বিক খাবার না, অধিক মশলা দিয়ে রান্না করা খাবার, অতিরিক্ত জালে সিদ্ধ খাবার, চাটনি জাতীয় ও ভুনা ভুনা জাতীয় খাবার সাত্ত্বিক খাবারের মাঝে থাকছে না, সাত্ত্বিক মানে একদম প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করে কোন প্রসেসিং এর মাধ্যমে না গিয়ে সরাসরি যা খাওয়া হয় তাই সাত্ত্বিক যাতে করে কোন প্রানী ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তাহলে ভাবুন নিরামিষ বা আমিষের নাম করে কে সাত্ত্বিক, তামসিক ও রাজস্বিক খাবার খাচ্ছেন? 

আর নিশ্চিত থাকুন খাবারের সাথে পাপ বা পূর্ন্যের কোন সম্পর্ক নাই, খাবারের প্রধান উদ্দেশ্য হলো খুদা নিবারণ করে শরীর ও মনের যত্ন নিশ্চিত করা। যে খাবার আপনার শরীরের জন্য উপযোগী ও গুনগত মান নিশ্চিত করে তা সাত্ত্বিক বা উত্তম খাবার। যে খাবার আপনাকে রোগগ্রস্ত করে তুলে অস্থির করে তা রাজসিক খাবার আর যা একদম বাসি পঁচা তাই তামসিক খাবার। পরিস্থিতি অনুযায়ী একই খাবার একজনের জন্য সাত্ত্বিক আরেকজনের জন্য রাজসিক ও তামসিক আহারে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। 

সনাতনী হিসাবে এইসব খাবারের মাঝে নিজের চিন্তা ভাবনা ও ধর্মকে আটকিয়ে না রেখে সঠিক জ্ঞান চর্চা ও সনাতনের আদর্শ অনুযায়ী যদি আমরা মনোনিবেশ করতে পারি তাহলে আমরা সবাই এক একজন এক এক গুনের অধিকার প্রাপ্ত হয়ে অমৃতস্য পুত্রঃ হিসাবে নিজেদের প্রমাণ করতে পারবো। ধর্ম তাই যা আমরা পজেটিভ ভাবে ধারণ করি, আর এই ধর্ম মানেই আমাদের কর্ম, কেউ যখন নিজের কর্ম থেকে দূরে সরে আসে সেটাই তার জন্য অধর্ম। তাই ধর্ম নামের কর্মকে যখন আপনি ধারণ করতে পারবেন, সে ধর্ম বা কর্ম আপনাকেই ধারণ করে আপনার সৌন্দর্য বিকশিত করে তুলবে৷ 

তর্কের খাতিরে যদি ধরেনি, আহারের মাঝে পাপ বা পূণ্য আছে, তাহলে সে পাপ বা পূণ্য নির্ধারণ করার আমি বা আপনি কে? যেখানে ঈশ্বর স্বয়ং বলছে কর্ম ফলের আশা ত্যাগ করে কর্ম করে যাও। তাহলে আমি মানুষ হয়ে আরেকজন মানুষের কর্মফল কিভাবে নির্ধারণ করি? বা আমিই বা কে এইটা বলার যে তুমি পাপী বা মূল্যহীন যদি তুমি এইভাবে না খেয়ে সেভাবে খাও?  সনাতন কোন দিন কোন ভাবে এমন বৈষম্য করতেই পারে না, সনাতন এই জন্যই সব চেয়ে সুন্দর ও চিরন্তন ধর্ম, যেখানে নিজের বিশ্বাস অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়ারও কোন সুযোগ নেই, অথচ নিজের কর্ম কি করছি তাতে মনোনিবেশ না করে আমরা উঠেপড়ে লেগে আছি অন্যের কর্মফল নির্ধারণ করতে। অনেক সময় ভাব এমন করি যে ঈশ্বর কি জানে তারচেয় আমি বাবা বেশি জানি। 

সনাতন বলে, যে যেভাবে আহার গ্রহণ করবে, সে সেভাবে গুনের অধিকার প্রাপ্ত হবে, আর তার গুনের উপর নির্ভর করে তার কর্ম নির্ধারণ হবে, আর সে কর্ম তাকে করতে হবে কর্মফলের আশা ত্যাগ করে, আর সে ফল যাই হোক না কেনো তা সে ব্যক্তিকেই ভোগ করতে হবে। তাই কর্ম করা কি উত্তম হবে নাকি আহার নিয়ে নিজেদের মাঝে মারামারি করাটা অধিক গুরুত্বপূর্ণ হবে? 

লেখাঃ পার্থ সারথী সরকার। 

Leave A Comment

“Everyday 1 Taka Fund” সনাতনীর আদর্শে পরিচালিত একটি সমাজ সেবামূলক ধর্মীয় অলাভজনক স্বেচ্ছাসেবী মূলক সংঘঠন।

গুরুত্বপূর্ণ লিংক

যোগাযোগ​

© 2023 All Rights Reserved By Everyday1Takafund